বিমান এমডি সাফিকুর রহমান" ডিগ্রী হলো একটি যোগ্যতার স্বীকৃতি, আর শিক্ষা হলো একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া
নজরুল ইসলাম : বিমানের এমডি সাফিকুর রহমান বিমানে ৩৩ বছর চাকুরি করেছেন। অবসর পরবর্তী পুনরায় নিয়োগ পাওয়া ও চেয়ারম্যান হওয়া চাকুরী ক্ষেত্রে তার সফলতার স্বাক্ষর বহন করে। তার পরিবারের হাউজহোল্ড কাজে নিয়োজিত গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে স্ত্রীসহ কারাগারে। একটি শিশু কন্যার প্রতি পরিবারের সদস্যদের দ্বারা সম্পাদিত অপরাধের যে চিত্র প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে উঠছে তা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে।
একজন ডিগ্রিধারী জ্ঞানী ব্যক্তিকে জ্ঞান দেওয়া সমীচীন নয়। ডিগ্রী অর্জন করা নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রাপ্তি, কিন্তু একে শিক্ষার একমাত্র বা চূড়ান্ত মানদণ্ড বলা যায় না। ডিগ্রী হলো একটি যোগ্যতার স্বীকৃতি, আর শিক্ষা হলো একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। ডিগ্রী মূলত একটি নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম শেষ করার আনুষ্ঠানিক প্রমাণপত্র। এটি কর্মসংস্থানের শুরুতে আপনার জন্য "দরজা খোলার চাবিকাঠি" হিসেবে কাজ করে। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা বা জ্ঞান হলো সেই পাঠ্যক্রমের নির্যাসকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার ক্ষমতা। সাফিকুর রহমান এখানে এসে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের আচার-আচরণ, বিবেক এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে উন্নত করে। আপনার যদি অনেক বড় ডিগ্রী থাকে কিন্তু মানুষের সাথে ব্যবহারের বা নৈতিকতার ঘাটতি থাকে, তবে সেই ডিগ্রী আপনাকে "শিক্ষিত" হিসেবে পূর্ণতা দেয় না।
কাজের লোককে নির্যাতন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এটি কেবল নৈতিকভাবে ঘৃণ্য কাজ নয়, বরং এটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। গৃহকর্মী বা কাজের লোক আপনার বাসায় শ্রম দিচ্ছেন, তার মানে এই নয় যে তিনি আপনার দাসে পরিণত হয়েছেন।
আইনি দৃষ্টিকোণ, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রচলিত আইনে গৃহকর্মী নির্যাতন একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, যদি গৃহকর্মী শিশু বা নারী হয় এবং তার ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, তবে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
শ্রম আইন, শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন নীতিমালা রয়েছে যা শারীরিক আঘাত বা অশোভন আচরণকে নিষিদ্ধ করে। মানবাধিকার ও নৈতিকতা, প্রত্যেক মানুষের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। কাউকে মারধর করা, আটকে রাখা, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়া বা গালিগালাজ করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সামাজিকভাবে এই ধরনের আচরণ মানুষকে নিচু মানসিকতার পরিচয় দেয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, ইসলামসহ সব ধর্মেই শ্রমিকের অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। হাদিসে আছে, "শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো" এবং তাদের সাথে পরিবারের সদস্যের মতো সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিজেরা যা খাবেন বা পরবেন, সাধ্যমতো তাদেরও তেমনটি দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
মানসিক প্রভাব, নির্যাতনের ফলে একজন মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ট্রমা বা মানসিক বৈকল্য তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে এটি তাদের পুরো ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেয়। মনে রাখা জরুরি, কোনো ভুল করলে তাকে বুঝিয়ে বলা বা প্রয়োজনে কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া আপনার অধিকার, কিন্তু গায়ে হাত তোলা বা অমানবিক আচরণ করা কোনোভাবেই আইনি বা নৈতিক অধিকার নয়।
পরিশেষে, শিক্ষার প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত একজন মানুষের চিন্তার স্বচ্ছতা, অর্জিত জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ এবং উন্নত ব্যক্তিত্ব। বড় ডিগ্রী সেই পথের একটি শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে মাত্র, গন্তব্য নয়। আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে যদি শফিকুর রহমানের এমন সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় দেশের প্রচলিত আইনে তাকে বিচারের মুখোমুখি করে একটি উদাহরণ সৃষ্টি হোক।
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট





































