সোমবার , ৩০ মার্চ ২০২৬
Monday , 30 March 2026
২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

নজরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১৯:০৮, ২৮ মার্চ ২০২৬

মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেছেন এটাতো মীমাংসিত

মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেছেন এটাতো মীমাংসিত

স্বাধীনতার স্থপতি, ঘোষক পাঠক এই মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে গেল ৫৫ বছর ধরে আমরা কুতর্কই করছি। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের এই উপলব্ধি নেই যে, সংগঠিত ঘটে যাওয়া ইতিহাসকে কাগজে কলমে ভুল উপস্থাপনা করে বিকৃত করা যায় না। বাঙালি জাতির অভিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর আতাউল গনি ওসমানী, মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউর রহমান সহ আরো অনেকেই বাঙালি জাতির বা জনগোষ্ঠীর পরাধীনতা, শোষণ, অবিচার এবং বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভের জন্য পরিচালিত সর্বাত্মক প্রচেষ্টা আন্দোলন সংগ্রামের উজ্জ্বল নক্ষত্র। 

স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে আবার বিতর্ক তুঙ্গে। আমরা তাদের আরও সম্মানিত করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে মৃত মানুষকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেই। এজেন্ডা ছিল "সবার আগে বাংলাদেশ, সেটাকে পিছনে ফেলে মীমাংসিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র যিনি পাঠ করেছিলেন তাদেরকে পাঠক হিসেবে এস্টাবলিস্ট করা অনেকটা ছোট করার শামিল। মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন এই বিষয়টা মীমাংসিত। তাই অতি সহজ প্রচলিত এই কুতর্কের উত্তর আমি এভাবেই দিতে চাই----যিনি নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি হলেন 'মস্তিষ্ক', আর যিনি ঘোষণা করছেন তিনি হলেন 'কণ্ঠস্বর'। কণ্ঠস্বর কখনোই মস্তিষ্কের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না।

স্বাধীনতার ঘোষক কিংবা ঘোষণা পত্র নিয়ে আরো একটু আলোচনা করব, তবে এর পূর্বে একটু প্রাসঙ্গিক আলোচনা করতে চাই। ইনসান হিসেবে আমরা আমরা বাঙালিরা কেমন? আমাদের সমাজে একটা প্রচলিত কথা আছে— "দুইজন বাঙালির যেখানে দেখা হয়, সেখানে তিনটা রাজনৈতিক দল তৈরি হয়।" কুতর্ক কিংবা অযথা বিতর্কের প্রবণতা আমাদের জাতীয় চরিত্রের এক কৌতুকপূর্ণ বিড়ম্বনার দিক। ​

কেন আমরা মীমাংসিত বিষয় নিয়ে কুতর্ক করি, তার পেছনে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে।
​আমাদের অনেকের মধ্যেই একটা প্রবণতা আছে যে, সব বিষয়েই আমার একটা মতামত থাকতে হবে। তথ্য বা যুক্তি না থাকলেও কেবল তর্কের খাতিরে তর্ক করাকে আমরা অনেক সময় বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব বলে ভুল করি। ​আমরা বাঙালিরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ জাতি। অনেক সময় বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক সত্যের চেয়ে আমাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি বা দলীয় রাজনৈতিক আনুগত্য বড় হয়ে দাঁড়ায়। যখন আবেগ যুক্তির ওপর চড়ে বসে, তখন প্রতিষ্ঠিত সত্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

​অন্যের মতকে গ্রহণ করা বা "আমি ভুল হতে পারি" এটা স্বীকার করার সংস্কৃতি আমাদের মাঝে নেই। ফলে একটি বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বা ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত হলেও আমরা সেটাকে মানতে চাই না, যদি তা আমাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায়। চায়ের কাপে ঝড় তোলার ঐতিহ্য আমাদের চমৎকার, কিন্তু অনেক সময় সেই আলোচনা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বদলে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। তথ্যের চেয়ে মুখরোচক গালগল্প আমাদের বেশি টানে। অনেক ক্ষেত্রে এই কুতর্ক আমাদের সময় এবং মেধা নষ্ট করে। যেখানে উন্নত জাতিগুলো মীমাংসিত সত্যের ওপর ভিত্তি করে সামনে এগিয়ে যায়, সেখানে আমরা অনেক সময় পেছনের দিকে হেঁটে পুরনো কাসুন্দি ঘাটতেই ব্যস্ত থাকি।

প্রডাক্টিভ নয় ,বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয় ,আকাশ পাতাল কথাবার্তাই বোঝা যায় আমরা কতটা প্রাণবন্ত এবং কথা বলতে ভালোবাসি। এই শক্তিটাকে যদি কুতর্ক থেকে সরিয়ে গঠনমূলক সমালোচনায় রূপান্তর করতে পারতাম তাতে আমাদের অগ্রগতি আরও দ্রুত হতো। ​আপনারা কি মনে করেন, আমাদের এই যে সহজাত স্বভাব সেখানে শিক্ষার অভাব, নাকি স্রেফ দীর্ঘদিনের অভ্যাস? এই প্রশ্নটিই আমাকে ভাবায়!

মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন। ​যিনি ঘোষণাটি পাঠ করছেন, তিনি কেবল একটি 'মাধ্যম' বা বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করছেন। মূল কৃতিত্ব সবসময় তার, যিনি পরিকল্পনা করেছেন বা সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন। আপনি যদি একজনের লেখা চিঠি অন্যকে পড়ে শোনান, তবে কথাগুলো আপনার হয়ে যায় না।

অফিস বা কোনো সংগঠনে যখন কোনো কর্মী বসের নির্দেশে কিছু ঘোষণা করেন, তখন সেটাকে বলা হয় 'On behalf of' বা কারো পক্ষ হয়ে ঘোষণা করা। এক্ষেত্রে:
​কৃতিত্ব: পরিকল্পনাকারীর।

ঘোষণাকারীর ভূমিকা কেবল তথ্য পৌঁছে দেওয়া। ​তবে যদি ঘোষণাকারী ব্যক্তি এমন চমৎকারভাবে বা দক্ষতার সাথে বিষয়টি উপস্থাপন করেন যে মানুষের কাছে সেটির গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়, তাতে তিনি 'ভালো উপস্থাপনার' জন্য প্রশংসা পেতে পারেন। কিন্তু মূল বিষয়বস্তুর কৃতিত্ব তার নয়।

ক্রিকেট মাঠে যখন আম্পায়ার 'আউট' ঘোষণা করেন, তখন তিনি কেবল নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি জানাচ্ছেন। আসল কৃতিত্ব সেই বোলারের যে উইকেটটি নিয়েছে, আম্পায়ারের নয়। যিনি নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি হলেন 'মস্তিষ্ক', আর যিনি ঘোষণা করছেন তিনি হলেন 'কণ্ঠস্বর'। কণ্ঠস্বর কখনোই মস্তিষ্কের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না।

ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট
Chief Editor Thesylhetpost.com 
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা ইউনিসন (আরএম)

সর্বশেষ

জনপ্রিয়